চানখাঁরপুলে জুলাই হত্যা মামলার রায়ে অসন্তোষ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারকে শহীদ পরিবারের স্মারকলিপি

প্রথম পাতা » আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল » চানখাঁরপুলে জুলাই হত্যা মামলার রায়ে অসন্তোষ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারকে শহীদ পরিবারের স্মারকলিপি
বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬



ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারকে শহীদ পরিবারের স্মারকলিপি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় সোমবার যে রায় দেওয়া হয়েছে, তাতে অসন্তোষ জানিয়ে স্মারকলিপি দিয়েছেন জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরা। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার বরাবর এই স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এদিকে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। এখন মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ এই মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হয়।

মঙ্গলবার টিএফআই সেলে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযোগ গঠনের বিরুদ্ধে প্রথমে শুনানি করেন আইনজীবী তাবারক হোসেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ শুনানি করেন আইনজীবীরা। প্যানেলের অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

এদিকে, টিএফআই সেলে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযোগ গঠনের রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) চেয়ে করা আসামিপক্ষের আইনজীবীদের শুনানিতে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, ‘ট্রাইব্যুনাল ইজ কোয়াইট স্ট্রিক্ট। এখানে অপরাধ প্রমাণ করতে না পারলে খালাস।’

শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী তাবারক হোসেন বলেন, এ মামলায় প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগের সঙ্গে আমার মক্কেলরা জড়িত নয়। ভুক্তভোগীরা যখন গুম হয়েছিলেন তখন তারা ছিলেন না। কিন্তু যারা ছিলেন তাদের নাম চার্জে নেই। এছাড়া প্রাইমা ফেসি (কোনো মামলায় যথেষ্ট প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত হলে তা পর্যাপ্ত বিপরীত সাক্ষ্যের অবর্তমানে প্রমাণিত বলে ধরে নেওয়া) না থাকলেও আমার মক্কেলদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

এ সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী আপনার (আসামিদের) বিরুদ্ধে অপরাধের উপাদান পাওয়া গেছে। এটাই প্রাইমা ফেসি। আইনজীবী তাবারক বলেন, মাই লর্ড, আমরা পুনর্বিবেচনা চাইছি। এ সময় ডিসচার্জ চেয়ে করা আবেদনটি পড়া শুরু করেন তিনি।

তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, নতুন গ্রাউন্ড থাকলে বলুন। এছাড়া আপনি বলছেন টিএফআই সেল মাত্র একটি কনসেপ্ট। কিন্তু প্রসিকিউশন বলবে আরেক কথা। এজন্যই ট্রায়াল। ট্রাইব্যুনাল ইজ কোয়াইট স্ট্রিক্ট। পরে পুনর্বিবেচনা চেয়ে করা আইনজীবীর আবেদনটি খারিজ করে দেন ট্রাইব্যুনাল।

২১ জানুয়ারি সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্রথম সাক্ষী হিসাবে জবানবন্দি দেন গুমের শিকার ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান। গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর এ মামলায় ১৭ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। মামলায় মোট আসামি ১৭ জন। এর মধ্যে ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলেন- র ্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, কর্নেল কেএম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), র ্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক কর্নেল মো. মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম।

পলাতক আসামিরা হলেন- ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, র ্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশিদ হোসেন, র ্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ ও র ্যাবের সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. খায়রুল ইসলাম।

আবু সাঈদের মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। এখন মামলাটি রায়ের অপেক্ষায় রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ এই মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হয়। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের এই ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

মঙ্গলবার প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম। ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, এই মামলার সব আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এখন ট্রাইব্যুনাল এই মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় রেখেছেন।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদসহ ৩০ জন এই মামলার আসামি। সাবেক এই উপাচার্যসহ মামলার ২৪ আসামি পলাতক। অন্য ছয় আসামি কারাগারে আছেন।

ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার বরাবর স্মারকলিপি: মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার বরাবর দেওয়া স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারকীয় সহিংসতায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তারা জাতির ইতিহাসে শহীদ হিসাবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাদের এই মহান আÍত্যাগ দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করেছে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে চানখাঁরপুল এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যে রায় দিয়েছেন, তা শহীদ পরিবারগুলো গভীর উদ্বেগ ও হতাশার সঙ্গে দেখছে। স্মারকলিপিতে উদ্বেগ ও হতাশার চারটি কারণ উল্লেখ করা হয়। প্রথমত, রায়টি আইনগতভাবে সংগত নয়। কারণ, সুস্পষ্ট ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও তা রায়ে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি, যা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দ্বিতীয়ত, প্রিন্সিপাল অফেন্ডারদের অপর্যাপ্ত শাস্তি এবং সুপিরিয়র কর্মকর্তাদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করায় ভবিষ্যতে এই রায় টিকবে কিনা, সে বিষয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। তৃতীয়ত, চানখাঁরপুলের রায়টি সম্পূর্ণরূপে জুলাই আন্দোলনের চেতনার পরিপন্থি। এর ফলে ১ হাজার ৪০০ শহীদ পরিবারের সদস্যরা চরমভাবে মর্মাহত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন। চতুর্থত, এই রায় ভবিষ্যতে একটি নেতিবাচক নজির হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় অনাকাক্সিক্ষত প্রভাব ফেলতে পারে। স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, এ অবস্থায় শহীদ পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, জুলাই আন্দোলনের চেতনার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের স্বার্থে রায়টি পুনর্বিবেচনার জন্য ট্রাইবুন্যালের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।

চানখাঁরপুলে হত্যা মামলায় মোট ৮ আসামি। এর মধ্যে তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন-ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলাম। বাকি পাঁচ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ডিএমপির রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছরের কারাদণ্ড; শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেনকে চার বছরের কারাদণ্ড, সাবেক কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সময়: ২২:১৫:৪৯   ৮৫ বার পঠিত  




আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’র আরও খবর


আবু সাঈদ হত্যা মামলায় কার কার কী সাজা হলো
শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে পরিবারের অসন্তোষ
আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় জানা যাবে বৃহস্পতিবার
মানবতাবিরোধী অপরাধ হাছান মাহমুদ-নওফেলসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
গুম অধ্যাদেশ ছিল অপ্রয়োজনীয়, ট্রাইব্যুনালের আইনেই বিচার সম্ভব: চিফ প্রসিকিউটর
শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলা সাক্ষ্য না নিয়ে সাক্ষী হিসেবে বক্তব্য রেকর্ডের অভিযোগ
শামীম ওসমানসহ ১২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি ১৯ এপ্রিল
সন্তানের জন্মের সময় স্ত্রীর পাশে থাকার অনুমতি পেলেন গুমের মামলার আসামি
ফজলে করিমসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল
শামীম ওসমানসহ ১২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি ১৯ এপ্রিল

Law News24.com News Archive

আর্কাইভ