
দেশে এক বা একাধিক ধরনের মাদক ব্যবহার করছেন প্রায় ৮২ লাখ মানুষ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। তবে এই বিপুল সংখ্যক মাদকসেবীর মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবার আওতায় এসেছে। বাকি ৮৭ শতাংশই রয়ে গেছে চিকিৎসার বাইরে।
এ তথ্য উঠে এসেছে একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায়। গতকাল রোববার রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) ‘বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরন ও সংশ্লিষ্ট কারণসমূহ’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে বিএমইউ এবং রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) যৌথভাবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই গবেষণা পরিচালনা করে। গবেষণার জন্য দেশের আট বিভাগের ১৩ জেলা ও ২৬ উপজেলার পাঁচ হাজার ২৮০ জনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরিমাণ ও গুণগত– উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করে গবেষণাটি করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাদক ব্যবহারকারীদের অর্ধেকের বেশি জীবনের কোনো না কোনো সময় মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেছে। তবে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং সুবিধা এবং সামাজিক ও আর্থিক সহায়তার অভাবে অধিকাংশই সে চেষ্টা ধরে রাখতে পারেনি।
তরুণদের ঝুঁকি বেশি
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাদক ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশই তরুণ। প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী আট থেকে ১৭ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেছে। আর ৫৯ শতাংশ ব্যবহারকারী ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে।
বিভাগভিত্তিক চিত্র
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী রয়েছে ঢাকা বিভাগে— ২২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৭০ জন। এরপর চট্টগ্রামে ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৫০৩ জন এবং রংপুরে ১০ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৮ জন। সবচেয়ে কম মাদক ব্যবহারকারী পাওয়া গেছে বরিশাল বিভাগে, চার লাখ চার হাজার ১১৮ জন।
কোন মাদক বেশি ব্যবহার হচ্ছে
মাদক প্রকারভেদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা— প্রায় ৬১ লাখ মানুষ এটি ব্যবহার করে। এরপর রয়েছে ইয়াবা বা মেথামফেটামিন (প্রায় ২৩ লাখ) ও অ্যালকোহল (২০ লাখ)। এ ছাড়া কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইনের ব্যবহারও রয়েছে। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।গবেষণার প্রধান গবেষক ও বিএমইউর ডিন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীরা এইচআইভি, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।
শহরের পাশাপাশি গ্রামেও বিস্তার
গবেষকরা বলছেন, শহরাঞ্চলে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও গ্রামাঞ্চলে এর বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। গবেষণায় মাদক ব্যবহারের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা ও মানসিক চাপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, মাদক তাদের জন্য সহজলভ্য।অনুষ্ঠানে বক্তব্যে বিএমইউর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার বলেন, মাদক সরবরাহের উৎস ও চাহিদা দুটোই কমাতে হবে। শিশু ও তরুণদের মাদকাসক্তির ভয়াবহ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, বর্তমান সময়ের বাস্তবতা হলো, দেশের মানুষ মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সামাজিক আন্দোলন ও একটি সামাজিক যুদ্ধের মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, মাদক প্রতিরোধে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার জরুরি। এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে, কিছু খারাপ মানুষই শুধু মাদকাসক্ত এবং আমরা বা আমাদের সন্তানরা মাদক থেকে দূরে আছি। বাস্তবে আমরা এবং আমাদের সন্তানরা সবাই মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে আছি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ গোলাম আজম, কো-ইনভেস্টিগেটর অধ্যাপক ডা. মো. তাজুল ইসলাম, ফোরকান হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ সময়: ৩:০৯:২৩ ৬৮ বার পঠিত