শনিবার, ২৩ মে ২০২৬

আল জাজিরার বিশ্লেষণ ‘পারমাণবিক শোডাউন’, বড় কিছু ঘটতে চলেছে?

প্রথম পাতা » আন্তর্জাতিক » আল জাজিরার বিশ্লেষণ ‘পারমাণবিক শোডাউন’, বড় কিছু ঘটতে চলেছে?
শনিবার, ২৩ মে ২০২৬



‘পারমাণবিক শোডাউন’, বড় কিছু ঘটতে চলেছে?

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো প্রথমবারের মতো সরাসরি রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছেন।

গত মঙ্গল থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রাশিয়া ও বেলারুশ একসঙ্গে কৌশলগত এবং ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক সক্ষমতার মহড়া চালায়। এটি পূর্ব ইউরোপ থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে।

যৌথ এই মহড়ায় লুকাশেঙ্কো এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সভাপতিত্ব করেন। এতে শত শত রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ এবং পারমাণবিক সাবমেরিন অংশ নেয়।

৭১ বছর বয়সি লুকাশেঙ্কো বলেন, আমরা কাউকে হুমকি দিই না। কিন্তু আমাদের হাতে এমন অস্ত্র রয়েছে এবং আমরা আমাদের যৌথ পিতৃভূমি— বেলারুশের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ব্রেস্ট থেকে রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় বন্দর ভ্লাদিভোস্তক পর্যন্ত সম্ভাব্য সব উপায়ে রক্ষা করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।

এক সময়ের সমবায় খামার পরিচালক লুকাশেঙ্কো ১৯৯৪ সাল থেকে তার সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্রটি শাসন করে আসছেন। তবে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের কাছে তিনি প্রায়ই ‘ইউরোপের শেষ একনায়ক’ হিসেবে পরিচিত।
বেলারুশ দীর্ঘদিন ধরেই মস্কোর রাজনৈতিক সমর্থন উপভোগ করছে। দেশটি রাশিয়ার কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা ও সস্তা জ্বালানি (হাইড্রোকার্বন) পেয়ে থাকে।
তবে ১৯৯০-এর দশক থেকে চলা ‘ইউনিয়ন স্টেট’ প্রকল্পের মাধ্যমে রাশিয়ার বেলারুশকে সম্পূর্ণভাবে একীভূত করার প্রচেষ্টাকে লুকাশেঙ্কো বহুবার প্রতিরোধ করেছেন।
তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে মিনস্কের সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ হয়েছে, যা বেলারুশের কূটনৈতিক অবস্থানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে— বেলারুশ কেন রাশিয়ার পারমাণবিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে?
গত বৃহস্পতিবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, কৌশলগত ও ‘ট্যাকটিক্যাল’ পারমাণবিক বাহিনীর প্রস্তুতির মাত্রা আরও বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান চার বছরের যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে পুতিন বলেন, মস্কো ও মিনস্ক উভয়ই ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’- এর অভিজ্ঞতাকে ভবিষ্যৎ কৌশলে বিবেচনায় নেবে।
এবার পুতিন এবং লুকাশেঙ্কো যৌথভাবে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হাইপারসনিক ‘ইয়ার্স’ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের নির্দেশ দিয়েছেন। এই ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে তিনটি আলাদা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে পারে।

উৎক্ষেপণের ২০ মিনিটেরও কম সময়ে ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় পাঁচ হাজার ৭৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে রাশিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আরখানগেলস্ক অঞ্চলের প্লেসেটস্ক কসমোড্রোম থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের কামচাটকা উপদ্বীপে গিয়ে নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছায়।
এই ধরনের দীর্ঘ-পাল্লার এবং উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু সামরিক সক্ষমতার প্রদর্শন নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তি-রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এনিয়ে জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিন আল জাজিরাকে বলেন, ঘটনাগুলো হঠাৎ করেই ঘটছে এবং বাইরে থেকে দেখলে এর কোনো স্পষ্ট তাৎক্ষণিক কারণ নেই বলে মনে হবে।

তবে তিনি বলেন, বড় কিছু একটা ঘটছে, যা সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও গণমাধ্যমের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হবে— এমনকি পারমাণবিক অস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি ইঙ্গিত দেন যে, এই সামরিক মহড়া কেবল নিয়মিত অনুশীলন নয়, বরং বৃহত্তর কৌশলগত পরিবর্তনের অংশ হতে পারে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।
মহড়ার অংশ হিসেবে মস্কো মিনস্ককে উন্নত এসইউ-২৫যুদ্ধবিমান এবং ইস্কান্দার-এমব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে, যার রেঞ্জ প্রায় ৫০০ কিলোমিটারপর্যন্ত।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বেলারুশে পারমাণবিক অস্ত্রও রাখা হয়েছে। এসব দেশটির আসিপোভিচি সামরিক ঘাঁটিতে সংরক্ষিত রয়েছে। এই ঘাঁটি ইউক্রেন সীমান্তের উত্তর দিকে ২০০ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পুরো মাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর কয়েক দিন পর, আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো তার দেশে একটি গণভোট আয়োজন করেন।

এই গণভোটের মাধ্যমে বেলারুশের সংবিধান সংশোধন করা হয়, যাতে দেশের ভূখণ্ডে পারমাণবিক অস্ত্র রাখার অনুমতি দেয়া হয়।
এরপর ২০২৩ সালের জুনে পুতিন ঘোষণা করেন যে, রাশিয়া বেলারুশে স্বল্প-পাল্লার পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করছে। তিনি দাবি করেন, এটি যুক্তরাষ্ট্র বহু দশক ধরে যা করে আসছে তারই প্রতিফলন— অর্থাৎ ইউরোপের ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্র রাখার প্রথার মতো একটি পদক্ষেপ।
পুতিন আরও জানান, রাশিয়া বেলারুশের কৌশলগত বোমারু বিমানগুলোকে আরও উন্নত করবে, যাতে সেগুলো পারমাণবিক বোমা বহনে সক্ষম হয়।
গত বুধবার ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, মস্কো যদি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে এই জোটের প্রতিক্রিয়া হবে ধ্বংসাত্মক।

তিনি শুক্রবার সুইডেনের হেলসিংবর্গে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি সম্মেলনে নেতৃত্ব দেবেন।
নতুন শঙ্কা
মস্কো ও মিনস্ক দাবি করেছে যে, এই সপ্তাহের সামরিক মহড়া একটি ‘অজ্ঞাত আগ্রাসনের হুমকির’ প্রতিক্রিয়ায় চালানো হয়েছে। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত ১৫ মে বলেন, রাশিয়া বেলারুশকে নতুন ধরনের আগ্রাসনমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলছে।
এর ছয়দিন পর জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেন, এই সামরিক মহড়া হয়তো মস্কোর এমন প্রস্তুতির অংশ, যার লক্ষ্য উত্তর ইউক্রেন এবং কিয়েভের দিকে নতুন করে আক্রমণ চালানো।

তার মতে, চলতি বছরে পূর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রেনের বড় অংশ দখলে ব্যর্থ হওয়ার পর রাশিয়া বিকল্প ফ্রন্ট খুঁজতে পারে।

বাংলাদেশ সময়: ১৩:০০:১৩   ২৬ বার পঠিত