শনিবার, ৯ মে ২০২৬

জবানবন্দি গ্রহণের অনিয়ম পর্যবেক্ষণে গঠন করতে হবে মনিটরিং টিম

প্রথম পাতা » সুপ্রিমকোর্ট » জবানবন্দি গ্রহণের অনিয়ম পর্যবেক্ষণে গঠন করতে হবে মনিটরিং টিম
শনিবার, ৯ মে ২০২৬



জবানবন্দি গ্রহণের অনিয়ম পর্যবেক্ষণে গঠন করতে হবে মনিটরিং টিম

নির্যাতনের মাধ্যমে প্রাপ্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির আইনগত কোনো মূল্য নেই বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে নীতিমালা প্রণয়ন করে দিয়ে আদালত বলেছে, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের আগে আসামিকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। যাতে সে পুলিশের প্রভাবমুক্ত হয়ে চিন্তা করতে পারে।

ফলে নির্যাতনের মাধ্যমে আসামির কাছ থেকে কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা হলে তা হবে কলুষিত প্রমাণ। আইনের দৃষ্টিতে ঐ জবানবন্দি মূল্যহীন। এ ধরনের জবানবন্দি কখনোই ‘স্বেচ্ছামূলক’ বা ‘সত্য’ হতে পারে না। বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি নাসরীন আক্তারের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এমন পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের সময় কি ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে সে ব্যাপারে গাইডলাইন (নীতিমালা) করে দিয়েছে হাইকোর্ট। “ইনজামামুল ইসলাম (জিসান) বনাম রাষ্ট্র” মামলায় পর্যবেক্ষণসহকারে এই নীতিমালা প্রস্তুত করেছে দেশের উচ্চ আদালত। গাইডলাইন অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের নেতৃত্বে মনিটরিং টিম একাধিক শীর্ষ নেতৃত্ব উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া আসছেন এনডিএ শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও।

গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকে সর্বত্র একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন। বেশ কয়েক জনের নামও সম্ভাব্যদের তালিকায় ছিল এবং সেখানে যার নাম ঘিরে সবচেয়ে বেশি জল্পনা ছিল তিনি হলেন গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। টিমের কাজ হবে জবানবন্দি গ্রহণের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে প্রতি তিন মাস অন্তর প্রধান বিচারপতির কাছে রিপোর্ট দাখিল করা। যেখানে উল্লেখ থাকবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের ক্ষেত্রে কোন অনিয়ম পরিলক্ষিত হচ্ছে কিনা। যদি অনিয়ম পাওয়া যায় তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এছাড়া রিমান্ডে থাকাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তি যেন তার পছন্দমতো আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন তাও নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। আইনজীবীর পরামর্শ ছাড়া পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে না।

জবানবন্দি রেকর্ড করার সময় যদি উভয় পক্ষ (প্রসিকিউশন ও ডিফেন্স) ইচ্ছা পোষণ করে, তবে তাদের আইনজীবীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ জবানবন্দি রেকর্ড ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ৩৪০(১) ধারার অধীনে একটি বিচারিক প্রক্রিয়া। সুতরাং জবানবন্দি দেওয়ার আগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অবশ্যই তার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার বা পরামর্শ করার সুযোগ দিতে হবে। সিআরপিসির ১৬৪ ধারার অধীন প্রদত্ত সকল জবানবন্দি অবশ্যই অডিও-ভিডিও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ করতে হবে। এছাড়া একাধিক আসামির জবানবন্দি একসঙ্গে রেকর্ড করা যাবে না। পাশাপাশি জবানবন্দি রেকর্ডের সময় সিআরপিসির ১৬৪ ও ৩৬৪ ধারার সকল আনুষ্ঠানিকতা ও নিয়মকানুন মেনে চলা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

প্রসঙ্গত: ২০১৪ সালের ৯ জুন ঢাকা সিটি কলেজের প্রীতি ফুটবল টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি ও খরচ বাবদ টাকা তোলাকে কেন্দ্র করে আয়াজ হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভিকটিমের বাবা অ্যাডভোকেট শহীদুল হক সিটি কলেজের বাণিজ্য বিভাগের ছয় ছাত্র জিসান, তৌহিদুল, মশিউর, শুভ, নাসিম ও আরিফের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। ২০১৫ সালের ১৩ মে আদালতে অভিযোগ পত্র দাখিল করা হয়। ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর আসামি জিসানকে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ জনকে যাবজ্জীবন সাজা দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালে হাইকোর্টে আপিল শুনানি হয়। শুনানিতে বলা হয়, রিমান্ড চলাকালে জিসানের ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি তার বাঁ পায়ের পাতার মাংস তুলে নেওয়া এবং ক্ষতস্থানে সিরিঞ্জ দিয়ে বিষ প্রয়োগের মতো অভিযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন অ্যাডভোকেট মো. শিশির মনির। ফলে রিমান্ড শেষে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জিসানের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।

পর্যবেক্ষণ:

নির্যাতন করে জিসানের কাছ থেকে জবানবন্দি আদায়ের প্রক্রিয়া নিয়ে মামলার রায়ে হাইকোর্ট নানা পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। চলতি বছরে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত বলেছেন, প্রাচীন ইউরোপে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায়ের প্রবণতা ছিল। তবে আধুনিক আইনে কেবল স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিরান্ডা বনাম অ্যারিজোনা’ মামলার নজির তুলে ধরে হাইকোর্ট বলেন, এ ধরনের জবানবন্দি নেওয়ার আগে অভিযুক্তকে তার নীরব থাকার অধিকার এবং আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করার সুযোগ দিতে হবে। আসামিকে পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে, যাতে সে পুলিশের প্রভাবমুক্ত হয়ে চিন্তা করতে পারে। এই মামলায় জিসানের ক্ষেত্রে তা সঠিকভাবে পালিত হয়েছে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে হাইকোর্ট।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সহিদুল বিশ্বাসের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে তাকে তার দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলার জন্য দায়ী করে হাইকোর্ট। রিমান্ডে জিসানকে নির্যাতন করায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেয়। আদালত মনে করেন, ভুল তদন্ত এবং অমানবিক প্রক্রিয়ায় আদায় করা স্বীকারোক্তি ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। এ কারণে আসামিদের বিচারিক আদালতের দেওয়া সাজা সংশোধন করে হাইকোর্ট।

বাংলাদেশ সময়: ২২:২১:৫৮   ২০ বার পঠিত