মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬

যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইরানের এরপর কী?

প্রথম পাতা » আন্তর্জাতিক » যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইরানের এরপর কী?
মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬



যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইরানের এরপর কী?

যুদ্ধ শুরুর পাঁচ সপ্তাহ পর সংঘাত নিরসনে প্রস্তাবিত একটি খসড়া পর্যালোচনা শুরু করেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যেও চলছে হুমকি-পাল্টা হুমকি। এতে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে বলেই মত বিশ্লেষকদের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার আল্টিমেটাম দিয়েছেন তা নাকচ করেছে ইরান। পাশাপাশি সাময়িক কোনো যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবেও রাজি না হওয়ার কথা জানিয়েছে দেশটি। এদিকে ট্রাম্পের আল্টিমেটাম শেষ হচ্ছে আজ। এই প্রেক্ষাপটে তিনি নতুন করে আরও ভয়াবহ হামলার হুমকি দিয়েছেন। বলেছেন, মঙ্গলবারের মধ্যে কোনো চুক্তি না হলে এবং জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু না হলে তিনি তেহরানে ‘নরক নামিয়ে আনবেন’।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিন শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। কিছু মিত্র দেশ ব্যতীত কোনো দেশের জাহাজই রুটটি পার হতে পারছে না। তেল ও গ্যাস সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ এই রুট কার্যত অচল থাকায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহনে ভূমিকা রাখা এই রুট ইরানের জন্য দরকষাকষির একটি কৌশলগত হাতিয়ার। সোমবার তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, তারা সাময়িক কোনো চুক্তির ভিত্তিতে এই নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি নয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানান, সাময়িক যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলবে না এবং কোনো সময়সীমা বা চাপও মেনে নেবে না। তার মতে, ওয়াশিংটন এখনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য প্রস্তুত নয়।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি পরিকল্পনা সামনে এসেছে, যেখানে প্রথমে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি এবং পরে ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে বিস্তৃত শান্তিচুক্তির আলোচনার প্রস্তাব রয়েছে। এ বিষয়ে অবগত একটি সূত্র জানায়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির রোববার দিবাগত সারারাত যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা নিজেদের স্বার্থের ভিত্তিতে অবস্থান ও দাবি নির্ধারণ করে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তা জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বলেন, আলোচনার বিস্তারিত পরে জানানো হবে। তবে তিনি যোগ করেন, আল্টিমেটাম ও যুদ্ধাপরাধের হুমকির সঙ্গে আলোচনা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি আরও বলেন, ইরানের দাবিগুলো কোনো আপসের ইঙ্গিত নয়, বরং নিজেদের অবস্থান রক্ষার আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন।

বহু প্রস্তাবের একটি যুদ্ধবিরতির আলোচনা: হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ওয়াশিংটনের কাছে ৪৫ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পৌঁছেছে। যা নিয়ে ওয়াশিংটনের স্থানীয় সোমবার দুপুর ১টায় বিস্তারিত কথা বলবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট (এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত কথা বলেননি ট্রাম্প)। ওই কর্মকর্তা বলেন, এটি অনেকগুলোর মধ্যে একটি প্রস্তাব এবং প্রেসিডেন্ট এখনো এতে সম্মতি দেননি। অপারেশন এপিক ফিউরি চলমান রয়েছে। যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা মূল্যায়ন করতে গিয়ে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম সামান্য কমে ব্যারেল প্রতি ১০৮.৬৭ ডলারে দাঁড়ায়। রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প অশালীন ভাষায় ইরানের জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোতে আরও হামলার হুমকি দেন। পরবর্তীতে তিনি নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে বলেন, মঙ্গলবার রাত ৮টা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেন, যেকোনো সমাধানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিয়ন্ত্রণে না আনলে মধ্যপ্রাচ্য আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।

ইসরাইলের হুঁশিয়ারি:

ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানের অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে এবং দেশটির নেতাদের একজন করে খুঁজে বের করা হবে। সোমবার ইসরাইল ইরানের আসালুয়েহ অঞ্চলের সাউথ পার্স পেট্রো কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে হামলার কথা জানায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এই কমপ্লেক্সের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। কারণ বিদ্যুৎ, পানি ও অক্সিজেন সরবরাহকারী দু’টি প্রতিষ্ঠানেও হামলা চালানো হয়। মার্চের মাঝামাঝি একই গ্যাসক্ষেত্রে হামলার পর সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা জানায়, বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে হামলা হয়েছে, তবে স্থাপনাটি অক্ষত রয়েছে। ট্রাম্প বারবার সতর্ক করেছেন, প্রয়োজনে তিনি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুর মতো বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা চালাতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ইরানের পাল্টা হামলা: সপ্তাহান্তে কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে পেট্রো কেমিক্যাল স্থাপনা ও ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট একটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, এই যুদ্ধে ইরানে ৩ হাজার ৫৪০ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ২৪৪ জন শিশু। ইসরাইলের হাইফায় একটি আবাসিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চারজন নিহত হয়েছে। এতে ইরান ও হিজবুল্লাহ’র হামলায় ইসরাইলি বেসামরিক নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৩-এ দাঁড়িয়েছে। এদিকে দক্ষিণ লেবাননে অভিযান এবং বৈরুতে হামলা চালিয়ে ইসরাইল-হিজবুল্লাহ সংঘাতও তীব্র আকার ধারণ করেছে। লেবাননে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪৬১ জন। যার মধ্যে অন্তত ১২৪ জন শিশু। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছে।

বাংলাদেশ সময়: ১৪:১৬:০৬   ১৪ বার পঠিত