বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নির্বাচনের প্রচারণা ও প্রতিশ্রুতি—বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া

প্রথম পাতা » জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ » নির্বাচনের প্রচারণা ও প্রতিশ্রুতি—বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া
বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬



নির্বাচনের প্রচারণা ও প্রতিশ্রুতি—বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া

সব জল্পনা-কল্পনা ও সন্দেহের অবসান ঘটিয়ে এখন মনে হচ্ছে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে নির্বাচন হতে যাচ্ছে ১২ই ফেব্রুয়ারি। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলা বিভিন্নভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং এরসঙ্গে প্রতিশ্রুতিও দিয়ে যাচ্ছেন। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও আমাদের গণতন্ত্র বলা যায়, এখনো আতুড় ঘরেই আছে। ফলে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি বিশেষ করে নির্বাচনের সময়ে অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশ, অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের তুলনায় অন্যরকম। অবশ্য বাংলাদেশের নির্বাচনের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচন তুলনা করা আপেলের সঙ্গে বরই-এর তুলনার মতো। বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় যেমন বড় বড় জনসভা, মিথ্যা প্রচারণা, অবাস্তব প্রতিশ্রুতি আর নিয়মিত মারামারি হানাহানি হয়ে থাকে, তার কোনটাই অস্ট্রেলিয়ায় নির্বাচনের সময় হয় না। আসলে অস্ট্রেলিয়ায় নির্বাচনের প্রেক্ষিতই ভিন্ন।

অস্ট্রেলিয়াতে সংসদীয় নির্বাচন হয় প্রতি তিন বছর পর পর। এই তিন বছর ধরা হয় প্রথম সংসদীয় অধিবেশনের পর থেকে। নির্বাচন কখনো কখনো তিন বছরের আগেও হতে পারে, তবে তা নির্ভর করে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের ওপরে। নির্বাচন আগে হোক বা সঠিক তিন বছরে হোক, নির্বাচনের সময় ঘোষণার আগে প্রধানমন্ত্রী গভর্নর জেনারেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সংসদ বিলুপ্তসহ নির্বাচনের দিন দেশবাসীকে অবগত করেন। এ ব্যাপারে গভর্নর জেনারেলও নির্বাচন রিট সম্পর্কিত আদেশপত্র জারি করেন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, অস্ট্রেলিয়া এখনো যুক্তরাজ্যের রাজতন্ত্র দ্বারা শাসিত একটা দেশ। গভর্নর জেনারেল যুক্তরাজ্যের রাজার প্রতিনিধিত্ব করেন, যদিও গভর্নর জেনারেল কে হবেন সেটা প্রধানমন্ত্রীই নির্ধারণ করেন।

একবার যখন সংসদ বিলুপ্ত এবং নির্বাচনের দিন ঘোষণা করা হয়, তখন থেকে সরকার কেয়ারটেকার মুডে চলে যায়। এই সময় সরকার কোনরকম তাৎপর্যপূর্ণ নীতিমালা, উল্লেখযোগ্য নিয়োগ ও বড় রকমের কোনো কনট্রাক্ট থেকে বিরত থাকেন। কেয়ারটেকার সম্পর্কিত চারটা বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যা এখানে আমি ইংরেজিতে হুবহু তুলে ধরছি-

১) Commencement: Starts when the House of Representatives is dissdolved or election writs are issued.২) Duration: Lasts until the election result is clear or a new government is appointed ( সাধারণত চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ).৩) Purpose: To prevent the incumbment government from making decisions that would bind a future government.৪) Conventions: The governments continues to manage daily operations but operates under restricted decision- making authority.

একবার যখন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয় তখন প্রধানমন্ত্রী ও ক্যাবিনেট বিভাগের সচিব এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশনারের স্বাক্ষরিত নির্দেশ সকল সরকারি কর্মচারীদের জানানো হয়, যাতে তারা কেয়ারটেকার কনভেনশন মেনে চলেন।

যদিও কেয়ারটেকার কনভেনশন বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ধারণার কাছাকাছি, তবে এক না। প্রধান পার্থক্য হল অস্ট্রেলিয়াতে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত বিদ্যমান সরকারই বহাল থাকে।

এবার বাংলাদেশে যা হচ্ছে তা অনেকটা জগাখিচুড়ির মতো, সরকারকে বলা হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যদিও অন্তর্বর্তী শব্দটা অনেকটা তত্ত্বাবধায়ক পর্যায়েই পড়ে, তবে পুরোপুরি না, আবার তারা বিপ্লবী সরকারও না, এ যেন না ঘরকা না ঘাটকা। ফলে সরকারের কার্যকারণ নিয়ে নানারকম বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে বিশেষ করে এই নির্বাচনের সময়। ডক্টর ইউনূসের সরকার আসলে সাধারণ গণতান্ত্রিক কেয়ারটেকার কনভেনশন মেনে চলছেন না। যার ফলে সরকার ঠিক নির্বাচনের আগে এমন এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যেমন সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো, বন্দর পরিচালনার কন্ট্রাক্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষ চুক্তি, যা পরবর্তী সরকারের জন্য বিশেষ বোঝা হয়ে উঠতে পারে। অবশ্য নিন্দুকেরা বলে থাকেন এটা সরকার ইচ্ছা করেই করছে যাতে পরবর্তী সরকার বিপদে পড়ে।

আগেই বলেছি অস্ট্রেলিয়াতে নির্বাচনের প্রচারণা ও প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে প্রধানত দু’টি দল। একটি হলো লেবার পার্টি আরেকটি হলো লিবারেল-ন্যাশনাল কোয়ালিশন পার্টি (যারা অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল) এবং কে কোন এলাকা থেকে প্রার্থী হবেন তা আগেই নির্ধারিত থাকে। এখানে নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা বাংলাদেশের মতো অত বড় বড় সভা করেন না বা পোস্টার  প্ল্যাকার্ড দিয়ে দেয়াল বা রাস্তাঘাট ঢেকে দেন না। তারা কখনো কখনো প্যামপ্লেট বাড়ি বাড়ি দিয়ে যান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন যেটাকে বলা হয় ডোর নকিং। আর নির্বাচনের নীতিমালা  ও প্রতিশ্রুতি দলের কেন্দ্রীয়ভাবেই প্রকাশ করা হয়। প্রতিটা প্রতিশ্রুতি কীভাবে কার্যকর করবে তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হয় বিশেষ করে এই প্রতিশ্রুতি পালনে কত টাকা খরচ হবে এবং তা কোত্থেকে আসবে তা উল্লেখ করতে হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রতিটি দলই ট্রেজারি থেকে দেশের আর্থিক অবস্থার ধারণা নিতে পারেন। কোনো দল যদি ট্রেজারির আর্থিক অবস্থার অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি করে তাদেরকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে ওই অতিরিক্ত অর্থ কোথা থেকে আসবে সেটা ট্যাক্স বাড়িয়েই হোক বা অন্য কোনোভাবেই হোক। এটা যদি নিশ্চিতভাবে না করতে পারে তাহলে নিশ্চিতভাবে সেই দলের ভরাডুবি এবং নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।

বাংলাদেশে যদিও গণতান্ত্রিক রীতি-নীতির পর্যাপ্ত অভাব, তবু এই নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রধান দুই দল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের প্রধান দুই নেতা আগের তুলনায় অনেক সংযমী আচরণ করছেন। এ ব্যাপারে বিএনপি’র প্রধান জনাব তারেক রহমানের নাম অবশ্যই বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। এটা হয়তো তার দীর্ঘদিনের লন্ডনে বসবাসের কারণে। উনি হয়তো ওইখানে নিয়মিত যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক নেতারা কি ধরনের আচার-আচরণ করেন তা লক্ষ্য করেছেন। এটা খুবই আশার কথা যে উনি এটা লক্ষ্য করেছেন। কারণ বিদেশে অনেক বছর থাকার পরেও আমরা বাংলাদেশিরা ওই সব দেশের ভালো রীতিনীতির খুব একটা নজর দেই না বা দেয়ার সময়ও থাকে না। যেহেতু বিদেশে আমরা সময় পেলে দাওয়াত খাওয়া এবং খাওয়ানো নিয়েই ব্যস্ত থাকি। তারপরও যদি সময় থাকে তাহলে আমরা হয়তো হিন্দি সিনেমা দেখে সময় কাটাই (যদিও ভারত আমাদের এখন এক নাম্বার শত্রু)। অবশ্য উনি ক্ষমতায় যাওয়ার পরে এরকম আচরণ করবেন কিনা তা ভবিষ্যতই বলে দেবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক, অস্ট্রেলিয়ান প্লেগ লোকাস্ট কমিশন।

বাংলাদেশ সময়: ১৬:১০:০৭   ১১৮ বার পঠিত