দিতে হবে ১০ লাখ টাকা। সেই টাকার বিনিময়ে পাওয়া যাবে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর। আগ্রহী হলে চাকরিপ্রার্থীর মূল শিক্ষাসনদ জমা দিতে হবে। পুরো টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত সেই সনদ ফেরত পাওয়া যাবে না। আর আগাম টাকা দিতে না পারলে দুই থেকে তিন লাখ টাকার ব্যাংক চেক স্বাক্ষরসহ দিতে হবে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া চক্রের সদস্যরা চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে এভাবেই লিখিত চুক্তি করতেন। গ্রেপ্তার সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে এ কথা জানান।
গত বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অভিযান চালিয়ে এই চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। তাঁদের কাছ থেকে ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, চাকরিপ্রার্থীদের ১০টি সনদ, ৪০ জনের ব্যাংক চেকের পাতা ও ব্যাংকের চেক বই জব্দ করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০), কম্পিউটার অপারেটর মো. জাহাঙ্গীর (৩৮), কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩), পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩) এবং চক্রের দুই সদস্য মফিজুল ইসলাম (২৩) ও মো. হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন। গতকাল আদালতের মাধ্যমে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, চক্রকে পুরো টাকা দেওয়ার পরই সনদ ফেরত পেতেন প্রার্থীরা। যাঁরা একসঙ্গে আগাম টাকা দিতে পারতেন না, তাঁদের কাছ থেকে স্বাক্ষর করা ব্যাংকের চেকের পাতা নেওয়া হতো। এসব চেকের প্রতিটির বিপরীতে দুই থেকে তিন লাখ টাকা করে লেখা থাকত বলে জানান লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
এসআরবি ৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগের বাছাই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় মতিঝিল থানায় করা মামলার ছায়া তদন্ত করছে এসআরবি। তিনি বলেন, নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়ার শর্তে চক্রের সদস্যরা চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে স্ট্যাম্পে ১০ লাখ টাকার লিখিত চুক্তি করতেন। পুরো টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত চাকরিপ্রার্থীদের মূল শিক্ষাসনদসহ তাঁদের হেফাজতে রাখা হতো। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, চক্রকে পুরো টাকা দেওয়ার পরই সনদ ফেরত পেতেন প্রার্থীরা। যাঁরা একসঙ্গে আগাম টাকা দিতে পারতেন না, তাঁদের কাছ থেকে স্বাক্ষর করা ব্যাংকের চেকের পাতা নেওয়া হতো। এসব চেকের প্রতিটির বিপরীতে দুই থেকে তিন লাখ টাকা করে লেখা থাকত বলে জানান লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
এসআরবির আরেকজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, স্বাক্ষরসহ অন্তত ৪০ জন চাকরিপ্রার্থীর প্রত্যেকের কাছ থেকে দুই থেকে তিন লাখ টাকার ব্যাংক চেক নিয়েছেন চক্রের সদস্যরা। প্রশ্নপত্র কার কাছ থেকে, কীভাবে চক্রের সদস্যদের হাতে পৌঁছেছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
এনবিআরের কর্মচারীদের হাত ঘুরে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তর ওই চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে ছড়িয়ে পড়ে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর সেটির উত্তর তৈরি করে চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে তাঁদের মাধ্যমে সম্ভাব্য পরীক্ষার্থী ও প্রশ্নপত্রের গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে যায় উত্তরপত্র।
ফায়েজুল আরেফীন জানান, এনবিআরের কর্মচারীদের হাত ঘুরে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তর ওই চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে ছড়িয়ে পড়ে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে মোবাইলে প্রশ্নপত্রের একটি অস্পষ্ট ছবি পান এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ। সকাল সোয়া ছয়টার দিকে একই প্রশ্নপত্রের আরও স্পষ্ট ছবি পান একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর। এরপর প্রশ্নপত্রের উত্তর তৈরি করা হয়। সেই উত্তরপত্র চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়। তাঁদের মাধ্যমে তা পৌঁছে যায় সম্ভাব্য পরীক্ষার্থী ও প্রশ্নপত্রের গ্রাহকদের কাছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় মতিঝিল থানায় করা মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মীর্জা মোহাম্মদ মুক্তা জানান, মামলার নথিপত্র আজ রোববার সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হবে।
সকাল সোয়া ছয়টার দিকে একই প্রশ্নপত্রের আরও স্পষ্ট ছবি পান একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর। এরপর প্রশ্নপত্রের উত্তর তৈরি করা হয়। সেই উত্তরপত্র চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়। তাঁদের মাধ্যমে তা পৌঁছে যায় সম্ভাব্য পরীক্ষার্থী ও প্রশ্নপত্রের গ্রাহকদের কাছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তদন্তে গত শনিবারই পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে গঠিত কমিটি এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এর মধ্যে গত শুক্রবার নতুন করে এই নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে এ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হয়েছিলেন ৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৭৬ জন চাকরিপ্রার্থী। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ওই দিন বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঢাকা মহানগরের ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর ছড়িয়ে পড়ে। সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় পরদিন ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. আতিকুর রহমান বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় মামলা করেন।
বাংলাদেশ সময়: ১১:০৯:৩৬ ১৩ বার পঠিত #উন্নয়নের #চুক্তি #নিয়োগ #পরীক্ষার #পাওয়ার #প্রশ্ন #যুব #হয়