নির্বাচন বদলায় কিন্তু ক্ষমতার চরিত্র বদলায় না কেন?

প্রথম পাতা » প্রধান সংবাদ » নির্বাচন বদলায় কিন্তু ক্ষমতার চরিত্র বদলায় না কেন?
সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬



নির্বাচন বদলায় কিন্তু ক্ষমতার চরিত্র বদলায় না কেন?

আসন্ন নির্বাচন ঘিরে ‘পরিবর্তন’ শব্দটি আবার উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কি ব্যবস্থার, নাকি কেবল মুখের? ইতিহাস বলে, যদি নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হয়, কিন্তু ভূমি সংস্কার, কর ব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্য, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতা প্রশ্নে কোনো মৌলিক সংস্কার না আসে, তাহলে দরিদ্র মানুষের জীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আসে না। গণতন্ত্র তখন থাকে, কিন্তু ন্যায়বিচার থাকে না।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি। ভোটাধিকার থাকলেও যদি মানুষের জীবিকা নিরাপদ না হয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়, এবং রাজনৈতিক দলগুলো বড় পুঁজির ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে রাষ্ট্রনীতি দরিদ্রের পক্ষে যায় না। গণতন্ত্র তখন ধনীদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি বৈধ কাঠামোতে পরিণত হয়।

তাই প্রশ্নটা আসলে নির্বাচন হবে কিনা, সেটি নয়; প্রশ্ন হলো, নির্বাচনের পর রাষ্ট্র কার পক্ষে দাঁড়াবে? যদি নতুন সরকারও পুরোনো কাঠামোর ভেতরে থেকেই পরিচালিত হয়, তবে গরিব মানুষের ভাগ্য বদলাবে না। প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি নাগরিকদের সচেতন ও সংগঠিত অংশগ্রহণ।

উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তরের ওপর– রাষ্ট্র কি জনগণের মালিকানায় যাবে, নাকি কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার বৈধতা নবায়ন করবে? যতদিন এ প্রশ্নের সৎ ও কাঠামোগত উত্তর না পাওয়া যাবে ততদিন গণতন্ত্র থাকবে কিন্তু তার সুফল থাকবে সীমিত।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণতন্ত্র কেন বারবার প্রত্যাশা ভঙ্গ করে–এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের শুধু ভেতরের রাজনীতির দিকে তাকালেই চলবে না; তাকাতে হবে বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামোর দিকেও। কারণ উন্নয়নশীল বিশ্বের গণতন্ত্র আজ আর কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, বরং তা গভীরভাবে জড়িত উন্নত দেশগুলোর ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে। ফলে নির্বাচন থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতা অনেক সময় জাতির সীমানার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না।

রাজনৈতিক বিজ্ঞানের একটি বহুল আলোচিত তত্ত্ব হলো ডিপেন্ডেন্সি থিওরি, যা আন্দ্রে গুন্ডার ফ্র্যাঙ্ক ও সামির আমিনের লেখায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশগুলো একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার মধ্যে আটকে আছে, যেখানে তারা কাঁচামাল, সস্তা শ্রম এবং বাজার সরবরাহ করে; আর উন্নত দেশগুলো নিয়ন্ত্রণ করে পুঁজি, প্রযুক্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। এই নির্ভরশীলতার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও যেখানে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ জনগণের চাহিদার চেয়ে বেশি প্রভাবিত হয় আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা, ঋণদাতা রাষ্ট্র এবং বৈশ্বিক করপোরেট স্বার্থ দ্বারা।

নওম চমস্কির বিখ্যাত বই ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ আমাদের শেখায় কীভাবে গণতন্ত্রের নামে আসলে জনমত তৈরি করা হয়। যদিও বইটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ব্যবস্থা নিয়ে লেখা, এর ধারণা উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। উন্নত দেশগুলো সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ না করেও নির্বাচন প্রভাবিত করতে পারে–নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, উন্নয়ন সহায়তা, কূটনৈতিক চাপ, এনজিও নেটওয়ার্ক এবং মিডিয়া ন্যারেটিভের মাধ্যমে। ফলে কোন সরকার ‘গ্রহণযোগ্য’ আর কোনটি ‘অগ্রহণযোগ্য’–তা অনেক সময় জনগণ নয়, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশসহ বহু উন্নয়নশীল দেশে ১৯৭১ পরবর্তী নির্বাচনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন খুব কমই বদলেছে। কারণ যে সরকারই আসুক, তাদের আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন– আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং উন্নয়ন সহযোগীদের শর্ত মেনে চলতে হয়। ডেভিড হার্ভির ‘অ্যা হিস্টরি অব নিওলিবারেলিজম’ বইয়ে দেখানো হয়েছে কীভাবে নিওলিবারাল নীতিমালা রাষ্ট্রকে কল্যাণমূলক ভূমিকা থেকে সরিয়ে বাজারের দালালে পরিণত করেছে। এর ফল হলো, নির্বাচন হয় কিন্তু স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি বা শ্রমিক স্বার্থে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমে যায়; লাভবান হয় এলিট শ্রেণি।

এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ‘পরিবর্তন’ প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত হবে তখনই, যখন প্রশ্ন তোলা হবে–এ নির্বাচন কি বৈশ্বিক নির্ভরতার কাঠামো ভাঙতে পারবে? যদি না পারে তাহলে সরকার বদলালেও গরিব মানুষের জীবন বদলাবে না। কারণ দারিদ্র্য শুধু জাতীয় ব্যর্থতা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক অর্থনীতির ফল।

রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে ইশতেহারে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, ক্ষমতায় যাওয়ার পর তার বড় অংশ বাস্তবায়িত না হওয়া উন্নয়নশীল দেশগুলোতে একটি পরিচিত দৃশ্য। এর প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, ইশতেহারকে এখানে নীতিগত চুক্তি নয়; বরং নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দেখা হয়। ভোট জয়ের জন্য জনপ্রিয় ও আবেগনির্ভর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু সেগুলোর আর্থিক, প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি বাস্তবতা নিয়ে দলগুলো নিজেরাই অনেক সময় আন্তরিকভাবে ভাবে না। ফলে ক্ষমতায় গিয়ে বাস্তবতার মুখে পড়ে প্রতিশ্রুতি ধীরে ধীরে ঝরে যায়।

দ্বিতীয় বড় কারণ হলো ক্ষমতায় আসার পর অদৃশ্য চাপ। সরকার গঠনের পর রাষ্ট্র কেবল জনগণের সঙ্গে নয়, বরং আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ী এলিট, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী দেশ এবং করপোরেট স্বার্থের সঙ্গে এক জটিল সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। অনেক ইশতেহার বাস্তবায়ন করলে এই শক্তিগুলোর স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে সরকার ‘বাস্তববাদ’-এর নামে প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে। এখানে গণতন্ত্র টিকে থাকে কিন্তু নীতির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় জনগণের বাইরে।

তৃতীয় কারণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির অভাব। অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে এমন কোনো শক্তিশালী আইনি বা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই, যা সরকারকে ইশতেহার বাস্তবায়নে বাধ্য করবে। সংসদ দুর্বল হলে, বিরোধী দল কার্যকর না হলে এবং বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন না হলে সরকার সহজেই প্রতিশ্রুতি ভুলে যেতে পারে। ভোটের মধ্যবর্তী সময়ে নাগরিকদের হাতে কার্যকর চাপ সৃষ্টির উপায় না থাকলে ইশতেহার কেবল কাগজেই থাকে।

চতুর্থ কারণ হলো দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের দুর্বলতা। অনেক রাজনৈতিক দলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় অল্প কয়েকজন নেতার মাধ্যমে। ইশতেহার প্রণয়নে তৃণমূল কর্মী, বিশেষজ্ঞ বা সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ সীমিত থাকে। ফলে ক্ষমতায় গিয়ে নেতৃত্বের অগ্রাধিকার বদলালে ইশতেহারও গুরুত্ব হারায়। দল জনগণের প্রতিনিধি না হয়ে নেতাকেন্দ্রিক সংগঠনে পরিণত হয়।

পঞ্চমত, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রাজনীতি ও অর্থনীতির গভীর জোট ইশতেহার বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা। বড় প্রকল্প, ঠিকাদারি, ব্যাংকিং সুবিধা, কর ছাড়– এসব বিষয়ে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির চেয়ে ক্ষমতাকেন্দ্রিক লেনদেন বেশি প্রাধান্য পায়। ফলে দরিদ্র, কৃষক, শ্রমিক বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিশ্রুতিগুলো সবচেয়ে আগে বাদ পড়ে।

এ বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য প্রথম সমাধান হলো ইশতেহারকে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে সরকারকে নির্দিষ্ট সময়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে জনগণ বুঝতে পারবে কোন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনটি হয়নি– এবং কেন।

দ্বিতীয় সমাধান হলো শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে সংসদ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন সংস্থা এবং বিচার ব্যবস্থা। যেখানে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী, সেখানে ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর রাষ্ট্র নির্ভর করে না। গণতন্ত্র তখন ব্যক্তিনির্ভর না হয়ে নিয়মনির্ভর হয়।

তৃতীয়ত, দরকার নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা। নির্বাচন শেষ হলে জনগণ যেন রাজনীতি থেকে সরে না যায়। ইশতেহার ট্র্যাকিং, নীতি নিরীক্ষা এবং তথ্যভিত্তিক সমালোচনা গণতন্ত্রকে জীবন্ত রাখে। চাপ না থাকলে ক্ষমতা স্বেচ্ছায় জবাবদিহি করে না– ইতিহাস সেটাই শেখায়।চতুর্থ সমাধান হলো অর্থনৈতিক গণতন্ত্র নিশ্চিত করা। যতদিন রাজনীতি বড় পুঁজির ওপর নির্ভরশীল থাকবে ততদিন নীতিও বড় পুঁজির পক্ষে যাবে। রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা, নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা এবং শ্রমজীবী মানুষের সংগঠিত অংশগ্রহণ ছাড়া ইশতেহার বাস্তবায়ন অসম্ভব।

সুতরাং উন্নয়নশীল দেশগুলোর গণতন্ত্রের সংকট কোনো ব্যক্তির বা দলের ব্যর্থতা নয়, এটি একটি স্ট্রাকচারাল সমস্যা। প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু অবাধ নির্বাচন নয়, দরকার অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, নীতিনির্ধারণে জনগণের নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণ। নইলে গণতন্ত্র থাকবে কাগজে, নির্বাচন থাকবে ক্যালেন্ডারে– কিন্তু ন্যায়বিচার থাকবে অধরাই।

ড. জিয়া আহমেদ: শিক্ষক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

বাংলাদেশ সময়: ১৬:৩২:১২   ১১৮ বার পঠিত  




প্রধান সংবাদ’র আরও খবর


শেখ হাসিনা শরণার্থী নাকি অনুপ্রবেশকারী, অমিত শাহর উদ্দেশে অভিষেক
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক সকালে, সবার নজর পাকিস্তানে
চট্টগ্রামে মিলল ১৫ কোটি টাকার ইয়াবা
লেবাননে ইসরাইলি হামলায় বাংলাদেশি নারী নিহত
কোস্ট গার্ডের অভিযানে ৭ কোটি টাকার ইয়াবা জব্দ
‘দিস ইজ নট শাহবাগ স্কয়ার, মিস্টার আবদুল্লাহ’, হাসনাতকে স্পিকার
বৈরুতের ১৪টি এলাকা থেকে প্রবাসীদের নিরাপদ দূরত্বে যাওয়ার নির্দেশ
ঢাকা বারের নির্বাচন বিএনপি-জামায়াতের পৃথক প্যানেল, মনোনয়ন ফরম না দেয়ার অভিযোগ ২০ স্বতন্ত্র প্রার্থীর
বদলি বাণিজ্যে শতকোটি টাকার অভিযোগে আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে দুদকে আবেদন
সালমান শাহ হত্যা: সামীরাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন ১৪ মে

Law News24.com News Archive

আর্কাইভ